Revenge Psychology: কেউ কেন প্রতিশোধ নিতে চায়?

মানুষ সাধারণত শান্তি চায়। কিন্তু যখন কেউ আমাদের সঙ্গে অন্যায় করে, আমাদের অনুভূতিকে আঘাত করে বা আমাদের সম্মানকে হুমকির মুখে ফেলে—তখন হৃদয়ের গভীরে এক ধরনের আগুন জন্ম নেয়, যাকে আমরা বলি প্রতিশোধের ইচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে—মানুষ কেন প্রতিশোধ নিতে চায়? প্রতিশোধ কি শুধু রাগের প্রকাশ, নাকি এর পেছনে আরও গভীর মনস্তত্ত্ব কাজ করে?

মনোবিজ্ঞান বলে, প্রতিশোধের ইচ্ছে আসলে মানুষের বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত। আমাদের মস্তিষ্ক মনে করে—যখন কেউ আমাদের ক্ষতি করেছে, তখন পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়া মানে নিজের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করা। আদিম সময়ে এটি ছিল বেঁচে থাকার কৌশল। যদি কেউ আপনাকে আক্রমণ করে আর আপনি চুপ থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে আপনার উপর বারবার হামলার সম্ভাবনা বাড়ত। তাই প্রতিশোধকে মস্তিষ্ক এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবেই দেখে।

কিন্তু আধুনিক সমাজে প্রতিশোধের ধরন অনেক সূক্ষ্ম হয়েছে। এখন আর শারীরিক আক্রমণ নয়—অপমান, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, মানসিক কষ্ট—এসবই মানুষের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, কেউ আপনাকে বিশ্বাস করিয়ে প্রতারণা করেছে। আপনি বুঝবেন—কষ্টটা শুধু ঘটনা থেকে নয়; কষ্ট আসে সম্মানহানি থেকে। প্রতিশোধ সেই অপমানের ভারসাম্য ফিরিয়ে দেওয়ার এক অবচেতন প্রচেষ্টা।

মনোবিজ্ঞানে প্রতিশোধ নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো Power Restoration—অর্থাৎ নিজের ক্ষমতার অনুভূতি ফিরে পাওয়া। যখন কেউ আমাদের কষ্ট দেয়, আমরা নিজেকে দুর্বল মনে করি। মনে হয়, নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাত থেকে সরে গেছে। প্রতিশোধ সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার মানসিক উপায়। তাই অনেক মানুষ বলে—“আমি তাকে দেখিয়ে দেব!”, এই দেখিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে আসলে নিজের মানসিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা।

আরেকটি বড় কারণ হলো Justice Illusion—মানুষ মনে করে, প্রতিশোধ মানে ন্যায়বিচার। যখন ন্যায় পাওয়া যায় না, তখন প্রতিশোধই অস্থায়ীভাবে ন্যায়ের অনুভূতি তৈরি করে। এই অনুভূতিই মানুষকে যুক্তিহীন কাজ করতে পর্যন্ত বাধ্য করতে পারে। অনেক সময় মানুষ ভাবে—“আমি যা পেয়েছি, তাকেও একইটা অনুভব করানোই ন্যায্য।” বাস্তবে এটি ন্যায় নয়, বরং মানসিক ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো Unfinished Emotion। যখন কোনো সম্পর্ক বা পরিস্থিতির পরিণতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়—যেমন কেউ হঠাৎ সম্পর্ক ভেঙে গেল, কোনো ব্যাখ্যা দিল না, বা আপনাকে সুযোগ না দিয়ে চলে গেল—তখন মস্তিষ্ক সেই অসম্পূর্ণ আবেগকে প্রতিশোধের মাধ্যমে পূরণ করতে চায়। মানুষ মনে করে—“যেহেতু সেই ব্যক্তি আমাকে কষ্ট দিয়ে গেল, আমিও তার জীবনে একটা চিহ্ন রেখে যাব।” এটি প্রতিশোধ নয়, বরং মানসিক Closure পাওয়ার আকুতি।

অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিশোধ আসে সামাজিক সম্মান রক্ষার অনুভূতি থেকে। মানুষ ভয় পায়—যদি আমি কিছুই না করি, তবে অন্যরা আমাকে দুর্বল ভাববে। এই ভয় থেকেই অনেক মানুষ এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা তেমন প্রয়োজনীয় নয়। আমাদের সমাজে “চুপ থাকলে মানুষ মাথায় ওঠে”—এই ধারণা প্রতিশোধকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

এবার আসা যাক মস্তিষ্কের জৈবিক দিক। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিশোধের ভাবনা মস্তিষ্কে dopamine নিঃসরণ বাড়ায়। অর্থাৎ প্রতিশোধ চিন্তা করলেই একটা “সন্তুষ্টির অনুভূতি” কাজ করে। এজন্য অনেকে বলে—“অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু তাকে শাস্তি দিয়ে মনে শান্তি পেলাম।” যদিও এ শান্তি সাময়িক, কিন্তু dopamine-এর কারণে এটা বাস্তব মনে হয়।

কিন্তু কি সবাই প্রতিশোধ নিতে চায়? না, সবাই চায় না। যারা আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যারা আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের মূল্য জানে—তারা প্রতিশোধের ইচ্ছে অনুভব করলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বরং তারা ভাবে—“আমার সময়, শক্তি ও মানসিক শান্তি অন্যের জন্য নষ্ট করার প্রয়োজন নেই।” এটাকে বলা হয় emotional maturity। যারা অপরাধীকে ক্ষমা করে এগিয়ে যেতে পারে, তারা প্রতিশোধের চেয়ে মানসিক শান্তিকে বেশি মূল্য দেয়।

অন্যদিকে কিছু মানুষ আছে যারা প্রতিশোধকেও ব্যবহার করে নিজের Self-Worth বাড়ানোর জন্য। এটি বলা হয় Ego Maintenance। তাদের মনে হয়, প্রতিশোধ নিলে নিজের অহং রক্ষা হয়। অথচ আসলে তারা দুর্বলতাকে ঢাকতে প্রতিশোধকে ব্যবহার করছে।

সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রতিশোধ কখনোই প্রকৃত শান্তি দেয় না। এটি সাময়িক তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের ভেতরে অপরাধবোধ, শূন্যতা ও মানসিক চাপ তৈরি করে। কেউ যদি আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, প্রতিশোধ নেওয়া আপনাকে শক্তিশালী করে না; বরং আপনার মনকে তার সঙ্গে আরও গভীরভাবে বেঁধে রাখে। প্রতিশোধ আপনাকে অতীতেই আটকে রাখে, আর মুক্তি দেয় ক্ষমা, দূরত্ব ও আত্মসম্মান।

তাই প্রতিশোধ নিতে চাওয়া মানবিক, কিন্তু প্রতিশোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই পরিণত মানসিক শক্তির পরিচয়। আপনার জীবনে যারা কষ্ট দিয়েছে—তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার চেয়ে নিজের শান্তি বেছে নেওয়াই প্রকৃত জয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *