কিয়ামতের দিনে মানুষ কার সামনে দাঁড়াবে?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। প্রিয় দর্শক, আজকের আলোচনাটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে নির্ধারক দিনের একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে—কিয়ামতের দিনে মানুষ কার সামনে দাঁড়াবে? দুনিয়াতে মানুষ সাধারণত কারো সামনে জবাব দিতে চায় না, নিজের ভুল অস্বীকার করতে চায়, ক্ষমতা বা ধনসম্পদের আড়ালে লুকাতে চায়। কিন্তু কিয়ামতের দিনে কোনো লুকোচুরি থাকবে না, কোনো অজুহাত থাকবে না, কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। সে দিন মানুষ এমন এক মহান ও পরাক্রমশালী সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে, যিনি নিজেই আসমান ও জমিনের মালিক—যিনি আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন।

কুরআনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, সেদিন মানুষকে তাঁরই সামনে হাজির করা হবে এবং তিনি প্রতিটি আমল বিচার করবেন। আল্লাহ বলবেন, আজ কার জন্য সার্বভৌম ক্ষমতা? আজ ক্ষমতা শুধু এক আল্লাহর, যিনি মহান, যিনি একক। সেই দিনের দৃশ্য হবে এতটাই তীব্র ও ভয়াবহ যে মা তার সন্তানকে ভুলে যাবে, গর্ভবতী নারী তার সন্তান ফেলে দেবে, মানুষ মাতালের মতো আচরণ করবে, অথচ তারা মাতাল থাকবে না—বরং আল্লাহর শাস্তির ভয় তাদেরকে বিক্ষিপ্ত করে দেবে। সেই日の প্রতিটি মানুষ কাঁপতে থাকবে, কারণ তারা জানে আজ কোনো মিথ্যা চলবে না, কোনো অস্বীকার গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহ নিজেই তাদের সামনে, আর সবকিছু জেনে রাখা তাঁর কাছে খুব সহজ।

কিয়ামতের দিনে মানুষ আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে তার সমস্ত কর্মসহ। দুনিয়ার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি ভাবনা, প্রতিটি দৃষ্টিও সে দিনে প্রকাশ পাবে। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ্য দেবে, ফেরেশতারা রেকর্ড তুলে ধরবে, আর আমলনামা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সে মুহূর্তে কেউ আর বলতে পারবে না, “আমি জানতাম না” বা “এটা আমি করিনি।” আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মানে হচ্ছে সত্যের সামনে দাঁড়ানো, আর সত্য থেকে পালানোর কোনো রাস্তা সেখানে নেই।

মানুষকে সেদিন একা দাঁড়াতে হবে। কোনো বন্ধু, কোনো আত্মীয়, কোনো নেতা, কোনো ধনসম্পদ তার কাজে লাগবে না। কুরআনে বলা হয়েছে, সেদিন মানুষ নিজের ভাই থেকে পালাবে, মায়ের কাছ থেকে, বাবার কাছ থেকে, স্ত্রী-সন্তান থেকেও পালিয়ে যাবে। কারণ প্রত্যেকে ব্যস্ত থাকবে শুধুমাত্র নিজের হিসাব নিয়েই। কিয়ামতের দিনে মানুষ এমনকি নবীদের কাছেও যাবে সাহায্য চাইতে, কিন্তু কেউই বলবে না “আমি তোমাকে বাঁচাতে পারব।” সবাই বলবে, আজমাত্র একজনই আছেন যিনি বিচার করতে পারবেন—আর তিনি হচ্ছেন আল্লাহ।

একটি হাদীসে এসেছে, আল্লাহ মানুষকে এত কাছে নিয়ে আসবেন যে সে তার সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় নিজের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আল্লাহ তাকে বলবেন, আমি তোমাকে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলিনি? আর তুমি কি এই কাজ করনি? তখন মানুষ নিজের লজ্জা ও ভয়ে হতবাক হয়ে যাবে। কেউ কেউ আল্লাহর সামনে মাথা নত করে বলবে, হে আমার রব্ব, আমি সত্যিই ভুল করেছি। যদি আল্লাহ তাঁর রহমত দান করেন, তবে সে ব্যক্তি বাঁচবে। আর যদি আল্লাহ বিচার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেন, তবে কারো পক্ষে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

মানুষ কিয়ামতের দিনে শুধু আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে না; বরং তিনি দাঁড়াবে এমন এক দৃশ্যের মধ্যে, যেখানে আল্লাহর মহিমা, শক্তি ও গৌরব এমনভাবে প্রকাশ পাবে, যা দুনিয়ার চোখ কোনোদিন দেখেনি। আসমান চিরে যাবে, পাহাড় ভেঙে ধুলায় পরিণত হবে, সূর্য কাছে এসে তাপ ছড়াবে, তারকারা ঝরে পড়বে। এই সবকিছুর মাঝে মানুষ বুঝতে পারবে—আজ সত্যিকারের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন, আর তাঁর সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

এই সত্যটি জানা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন আমরা বুঝতে পারি যে একদিন আমাদের আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, তখন জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বদলে যেতে শুরু করে। আমরা আর পাপে লিপ্ত হতে চাই না, কারণ জানি একদিন হিসাব দিতে হবে। আমরা আর অন্যায় করতে পারি না, কারণ আল্লাহ দেখছেন। আমরা ভালো কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ হই, কারণ জানি আল্লাহ আমাদের প্রতিটি সৎকাজ পুরস্কৃত করবেন। দুনিয়ার আদালতে বিচার ভুল হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর আদালতে বিচার সবসময়ই সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত হবে।

সুতরাং, প্রিয় দর্শক, আমরা সবাই যেন সেই মহামুহূর্তের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি। আমাদের আমল, আমাদের আচরণ, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছু যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই জায়গায় দাঁড়াবো, একই মহান রবের সামনে। আজ যদি আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি, কিয়ামতের দিন তিনি আমাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *